কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক ফরিদা মজিদ আর নেই। মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ভোর ৫টায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তিনি কবি গোলাম মোস্তফার নাতনি। তাঁর পরিবার থেকে জানায়, ফরিদা মজিদ ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। গত সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
ফরিদা
মজিদের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৭ জুলাই কলকাতায়।
করেন। পিতা প্রকৌশলী মহিবুল মজিদ, মাতা কবি গোলাম মোস্তফার বড় মেয়ে ও শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের
বড় বোন ফিরোজা
খাতুন জোছনার মেয়ে। কবি গোলাম মোস্তফার সান্নিধ্যেই তাঁর কবিসত্তা গড়ে ওঠে।
প্রাথমিক
পাঠক্রমের দ্বিতীয়ভাগ পড়ার কাল থেকে ফরিদার কবিতা লেখা শুরু এবং তখন থেকেই পত্র-পত্রিকার
ছোটদের পাতায় তাঁর কবিতার নিয়মিত প্রকাশ। কলাবিৎ ও সমাজ-সচেতন কিশোরী কবি ফরিদা কেন্দ্রীয়
কচি-কাঁচার মেলার আহ্ববায়িকা নির্বাচিত হয়েছিলেন এক সময়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হলেও সারাজীবনে তাঁর একটিমাত্র কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে।
‘গাঁদা ফুলের প্রয়াণ ও যারা বেঁচে
থাকবে’ শিরোনামের কবিতার বইটি দিয়েই তিনি কবি হিসেবে পরিচিত।
যৌবনের
গোড়া থেকে প্রবাসে বসবাস। প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য যেখানেই গিয়েছেন বা থেকেছেন, সেখানেই
শিল্প ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে নিজের জীবনকে যাপিত করে সমৃদ্ধ করেছেন পারিবারিক সূত্রে
পাওয়া সাহিত্যিক ও শৈল্পিক উত্তরাধিকার। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানকে
মার্কিন সাহায্যদানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে ফরিদার Washington, New York এর বিক্ষোভ
মিছিলে-সমাবেশে পাঠ।
কবি
দীর্ঘকাল প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। প্রথমে লন্ডনে, পরে নিউ ইয়র্কে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি লন্ডনে বসে দেশের বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের লেখা অনুবাদ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজ
করেন।
নীচে বামের ছবি এলেন গিন্সবার্গ আর ফরিদা মজিদ। ডানের ছবি জন এশবেরি আর ফরিদা মজিদ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ক অনুবাদ-কবিতাগুলির দু’টি সংকলন প্রকাশ করলেন ফরিদা ১৯৭২ ও ৭৪ সালে লন্ডনে। সূত্রপাত হল সালামান্দার ইমপ্রিন্ট কবিতা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের। প্রায় একক-প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এই প্রকাশনী থেকে ফরিদা পূর্বে অগ্রন্থায়িক কিছু বৃটিশ কবিদের বই বের করে ব্রিটেনের কাব্য জগতে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিলেন। ফরিদার গভীর সাহিত্যবোধ ও অনিন্দ্য সম্পাদকীয় রুচির পরিচায়ক এই বইগুলি বৃটিশ জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার ও অন্যান্য সম্মাননায় ভূষিত। নিজের ইংরেজি কবিতাও প্রসিদ্ধি পেয়েছিল এবং লন্ডন বসবাসের ইতি টানার আগ পর্যন্ত ফরিদা Commonwealth Poetry Prize এর বিচারকমন্ডলীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
তুলনামুলক
সাহিত্যে New York
University থেকে মাস্টার্স ও এম.ফিল।
নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত,
সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কে
ইংরেজি লেকচারার হিসেবে ছিলেন
। এছাড়াও তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ইংরেজির লেকচারার হিসেবে ছিলেন নিউইয়র্কের বিভিন্ন
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৬ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সাম্প্রতিক কালে অবসরপ্রাপ্ত। প্রবন্ধ, কবিতা রচনা ছড়া ইংরেজি-বাংলা সাহিত্য অনুবাদে লিপ্ত।
ফরিদা
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহর এলাকায় অধিষ্ঠিত অন্তঃধার্মিক সংগঠন, Interreligious
Center on Public Life এর
পর্ষদ সদস্য এবং ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের আদি সংগঠক ও বর্তমান কেন্দ্রীয়
কমিটির সদস্য।
ঢাকায়
তিনি তাঁর মায়ের ফ্ল্যাটেই একাকী জীবন যাপন করতেন।

